Saturday, July 19, 2014

সাতটি কবিতাঃ দেবল দেব

সাতটি কবিতাঃ দেবল দেব

কেন লিখি না

তোমাকে যখন পাই,
তরুণ কবির মতন, অঢেল কবিতা লিখতে চাই

যখন তোমাকে পাই না অনেক চেয়ে,
রাত পার করি মনে মনে একা বৈরাগী গাথা গেয়ে

তবুও কখনও ছড়া বা কাহিনী -
একটি লাইনও - লিখতে পারিনি

দিনের অন্তে সমস্ত কাজ পণ্ড যখন হয়,
সকল কাজের ফসল যখন ধুলায় লুটিয়ে রয়,
লিখতে পারিনে তবু  
ভুলতে পারিনে কভু,
আমার উপর ভার --
মহাকালজয়ী একখানি মহাকাব্য বিরচনার !

****


অচিন বঁধু

হাজার কাজের মাঝে, চেনা মুখের ভিড়ে,
খুঁ জতে থাকি না-চেনা সেই মানুষটিরে
প্রাণের আগল দেয় খুলে সেই অচিন বঁধু
নিজের মনেই জমা ছিল এত মধু,
নিজের মুখেই ধরা পড়ে চাঁদের আলো,
জানতাম না; বাসতে পারি এতো ভালো -
তাও তো আমি পারিনিকো বুঝতে আগে,
জানতে পেলাম বঁধুর অপার অনুরাগে

ভিড়ের মাঝে বঁধুর আনন যায় না দেখা
পরশটি পাই, যখনি হই নিবিড় একা
তারি সুবাস আনে বাতাস, গহন রাতে,
যে-প্রহরে হই একাকী, বঁধুর সাথে
রোমাঞ্চকর অলক্ষ্য তার হঠাৎ ছোঁয়ার
অসহ্যকর তূরীয়ানন্দে ডুবে যাওয়ার
অভিজ্ঞতার গর্বে আমার সকল ভাসে
খেদ রবে না,এখন যদি মরণ আসে

*****

ওথেলো


তাহার নিবিড় প্রেমে ডুবি যতক্ষন,
আর কারে ভালোবেসে
সুখ পায় কতটাসে,
জেনে কীবা মোর প্রয়োজন?

কিন্নরকণ্ঠ বুঝি, সে প্রেমী তরুণ?
নাকি বেশ ভালো কবি?
নাকি, আঁকে - তেলছবি?
(মেয়েরা এদের প্রতি সদাই করুণ।

ভাবি, তাকে বিশেষ কী দেয় সে-নাগর?
খুব সুপুরুষ বুঝি?    
অথবা জানে কিসেজি”-
বিন্দু কোথায় আছে,সুখের আকর?  

আমি তো অপাংক্তেয়, দীন, গুণহীন,
অথচ আমার প্রতি
তার স্নেহ, প্রেম, রতি-
নিবেদনে আমি ভরেউঠি, প্রতিদিন !

ওর কাছে আর কিছু নেই চাইবার
না-চাইতে এতো পেয়ে -
আনন্দে উপচে গিয়ে
বিনিময়ে দেবো, কিছু নেই তোআমার !

কেন যে মেটেনা তবু পিপাসা আমার!
নদীর দুইপার -  
আমারি তো অধিকার!
কেন আসে আন্জনা নদীর ওপার?

যদিবা নিদাঘে  কোন অচিন পথিক
এসে দেখে, নদীজল
দুই তীরে ছল্ছল,
ঝাঁপ দিতে চাইবে সে, এটাও তোঠিক

যদি সে নেমেই পড়ে নদীজলে, স্নানে,
নদী তো তরঙ্গাঘাতে
পারতো ফিরিয়ে দিতে,
যেমন আবর্জনা - জোয়ারের বানে। 

রবাহুত রাহীকে তো ফেরালো না নারী!
বরং সে কোলে নিয়ে,   
অঢেল আদর দিয়ে
কী রে যেযতো ভাবি, মন হয় ভারি

তবে কি পিরীতি তার অভিনয় শুধু?
এতোদিন আমি তার
খেলার জোগানদার?
অন্য কারো তরে তার সবটুকু মধু ?

না না, এআমার ঈর্ষা, হতে পারেনা ;
যদি বা প্রণয়ী তার
থাকেও বা জনা চার,
আমি যা পেয়েছি, পাবো, অঢেল পাওনা!

আমি কি বাসিনি ভালো, তাকে, অনিঃশেষ?
তবু যদি সে আমাকে
প্রবঞ্চনা করে থাকে,
এমন নিদয়, তবে এই তার শেষ

যে-প্রেমে হয় না দোঁহে পরস্পরে স্নাত,
যে-প্রেম সুড়ঙ্গে  চলে,
গোপন করতে বলে
কথা, মন, আঁখিভাষা, সে-প্রেম অজাত
  
অজাত প্রেমের চেয়ে হতপ্রেম ভাল
ওকে আজ মারি যদি,
সান্ত্বনা পাবে হৃদি
একদিন আমাকে বেসেছিল ভাল

***** 


অকালবর্ষণ


শুষ্ক, আগুন-ঝরা দারুণ নিদাঘকালে হঠাৎ বৃষ্টির শীতলজল -
কী স্নেহে জুড়িয়েদিল তৃষ্ণিত চরাচর। পত্রজিহ্বায় করছে পান
কৃতজ্ঞ বৃক্ষ গুল্ম-বীটপদল। খুশিতে স্নান করে পাখির দল
মধ্যজ্যৈষ্ঠের -অকালবর্ষণ কত না মমতায় বাঁচাল প্রাণ

প্রেমিকের কাছে আজ বর্ষার আবেদন সঙ্গ-আশ্লেষে কতোমধুর;
পরবাসী বণিকের কাছেও সে এনে দেয় কতো স্মৃতি,আদর আর উৎসবের  
বৃষ্টির রিমঝিম স্মরণ করিয়ে দেয় কতো-যে ভুলে-যাওয়া গানের সুর
প্রবীণের মনে পড়ে মা বলা ছড়া, আর কতো না রূপকথা শৈশবের

বুঝিনা, কবিরা কেন বৃষ্টির খোশামোদ করে যে, সর্বদা, রেই যায়
বোঝেই না, বর্ষণ সর্বদা শুভ নয়, আনে সে বন্যাও, প্রলয়কর
জানি, জানি, নিষ্ঠুর নিদাঘের রোষানলে যখন প্রাণীকুল মৃতপ্রায়,
তখন মমতাময় কয়েকটি দণ্ডের বর্ষা কতই যে শুভঙ্কর

কিন্তু আমার কাছে -অকাল বরিষণ, জানে না কেউ, কত কষ্টকর!
নির্জন হৃদয়কে কতখানি ভেদ করে বৃষ্টিবিন্দুর তীক্ষ্ণ শর

*****


আঁধার আলোর সৃষ্টি     

আদিতে আঁধার ছিল চরাচর জু ড়ে,
কোন্ সিসৃক্ষা মুক্তি দিল আলোকেরে -
জানে না কেহই, শুধু অনুমান 'রে
ধ্যানী মুনি-বিজ্ঞানী পড়েন ফাঁপরে।

আলো কি স্বয়ংজাত? না কি সে তামস-
গর্ভজাত স্ববিরোধ? সে কোন্ তাপস
এনেছিল রূপচ্ছটা অরূপের তটে,
আঁধারের ধ্যানমগ্ন বন্ধ আঁখিপটে?

নাকি -আলোই ছিল রূপ, চিরায়ত,
অন্ধকার শুধু তারি অরূপেচ্ছা-জাত
অতল কামনা? আলোকের থেকে অনালোক,
রূপ থেকে অরূপের, চূড়ান্ত নির্মোক?

আলো-আঁধারের যৌথ জন্ম আমি দেখি
নিজের অস্তিত্বে; বিস্ময়ে নির্বাক থাকি

*****

                         প্রলয়সাক্ষী


                   বৃষ্টি পড়ছে, বিজলি ঝলছে,
            ঘন ঘনআজ সারা রাত রে
       কাঁপে ধরিত্রী, পড়ে মহীরূহ
      মেঘের আড়ালে সব তারা গ্রহ
         লুকিয়েছে কোথা; আদিম আঁধারে
            আলোকের আশা কবে নিভে গেছে

                           -ঘোর রাতের যেন শেষ নাই
                একটিও দীপ জ্বালবে না আর
        কোন পুরবাসী, কোন গৃহকোণে
              অজ্ঞান সবে, সুখের স্বপনে,
                দেখতে পায় না করাল আঁধার
                     একা আমি জেগে, কাল গুণে যাই

                            চরাচর ব্যেপে অমোঘ প্রলয়    
                     আগত; মথিত সাগর, আকাশ। 
          যদি-বা এখনি জেগে ঠে সবে,
            রোজ কেয়ামৎ শিয়রে দেখবে;
               কেউ পাবে নাকো কোন আশ্বাস,   
                               বা ভুল শুধরে নেবার সময়। 

                             এই ভয়ানক পরিণতি জেনে,
                   জানিয়েছিলাম সকলকে ডেকে -  
           মহাবরষার কতো দিন আগে!
           সকলে আমায় পরিহাসে রাগে,
                    বিদায় করেছে সমষ্টি থেকে
                       মৌন হয়েছি নিয়তিকে মেনে
  
                       আগে সব জেনে  কি সুখ পেলাম,
                একা ভয় পেয়ে, একা জেগে থেকে?  
              ধ্বংস এসেছে ঘোর উল্লাসে,
            নবজীবনের ভোর বুঝি আসে -    
                    সৃজন দেখার আশার নিরিখে,
                              ধ্বংস দেখেই বিদায় নিলাম

******
[ প্রলয়সাক্ষীর প্রেক্ষাপট আমার কয়েক বছর আগের একটা অভিজ্ঞতা। কলকাতার কিছু আঁতেল ও পণ্ডিতদের একটা সেমিনারে আমি জগৎজোড়া আবহাওয়ার পরিবর্তনের স্পষ্ট কারণ ও ভয়ানক ফলাফলের প্রেক্ষিতে অবিলম্বে নিজেদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনবার কথা বলেছিলাম ; উন্নয়নের তাগিদে বড় বড় কারখানা বসানো, রোজগারের তাগিদে প্লাস্টিক থেকে পিসিবি - যে কোনও পরিবেশধ্বংসী জিনিস তৈরির কোম্পানিতে চাকরির উমেদারি করা, পয়সা হলেই গাড়ি কেনা, বাড়িতে এ-সি মেশিন বসানো, --- এগুলো এখনি বন্ধ করে ভবিষ্যপ্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখানো উচিৎ, এইসব বলেছিলাম। তাতে কয়েকজন বলেছিলেন, "আমাদের সূর্য তো কয়েক বিলিয়ন বছর পরে নিভে যাবে। তাই বলে কি আমরা এখনি সব উন্নয়ন বন্ধ করে গুহাবাসী হয়ে যাব?"]

প্রাপ্তি


অস্তিত্বের আদি ক্ষণে, প্রথম আলোর স্রোতে 
এসেছিল ডালি-ভরা বিচিত্র উপহার কত --
জীবনের লীলায়িত রহস্য উৎস থেকে ভেসে
সেসবের মূল্য কিছু বুঝি নি সেদিন
বুঝি নিকীকাজ হবে,অতগুলো সরঞ্জাম দিয়ে।
কত উপহার আমি ছুঁয়েও দেখিনি,
উপেক্ষায় হারিয়েছি কত আশ্চর্য সম্ভার,
আজ কোনও আক্ষেপেই আর
আসবে না ফিরে সেই সামগ্রীর ডালা

বয়স বেড়েছে শুধু। বাড়ে নিতো মগজের ক্রিয়ার পরিধি ! 
শরীর-সংগঠন-- থেকে গেছে নিষ্ক্রিয়, অকেজো !  
শিখে নিতে পারিনিকো ছন্দ শব্দের সুচারু প্রয়োগ,   
সংখ্যার রহস্যাবর্তে সাঁতরাতে ভয় পেয়ে,  
গিয়েছি এড়িয়ে যত গাণিতিক ন্যায়;
বিমূর্ত আকারের গঠনের, রৈখিক কৌণিক
সুষমাও চোখ তুলে দেখি নি কখনো।
বিশ্বামিত্র সুরের আহ্বানে পাতিনি শ্রবণ,
ঋতু রঙ্গে, তটিনীর তালে তাল দিতে শেখে নি -দেহ।
নীহারিকা, রামধনু, তারামাছ, ফড়িঙের উড়ানের
নিবিড় রহস্যভেদে হই নি প্রয়াসী।
রঙের ধারায় কোনও কল্পনাকে দিই নি বইয়ে

 জগতের, জীবনের, মননের সুবিপুল ঐশ্বর্য থেকে
 ফিরিয়ে রেখেছি মুখ,নিজের অপারগতা,অপটুতা জেনে
 অকর্মণ্য শরীরের নিস্ফল শোভন আড়ম্বরে,
 নিষ্ক্রিয় মগজের নিলাজ নৈঃশব্দে -
 চরম দারিদ্র আমি রাখি আবডালে
 জীবনের প্রবল উচ্ছ্বাস রাখি সম্ভাবনা-ছায়ান্তরালে। 

 তবুও যখন দেখি, আমারি তুলিতে অকস্মাৎ
 একদিন পড়েছিল ধরা অরূপের রঙ,
 যখন চমকে দেয় নিজেরি রচনা করা আচমকা অবাক পংক্তি,
 মগজের কোন এক কোণ থেকে সহসা নিঃসৃত সুরের লহরী
 যখন জাগিয়ে দেয় অহল্যা চেতনা; আদিম মৌলিক
 সংখ্যার মিছিল এসে যে-রাতে দেখিয়ে যায়, স্বপ্নের অছিলায়,
 অরূপের রূপ; সমগ্র অস্তিত্ব জেগে ওঠে অচিন্ত্য চেতনার ডাকে,
 তখনি জানতে পারি- কত না সম্পদ নেই আমার নাগালে,
 জীবনের কত শত উপহার ছুঁতেও পারি নি
 
যেটুকু এসেছে হাতে, যেটুকু নিয়েছি,
 
তাকেও করি নি ব্যবহার

 যে-কোরক ঝরে গেল, বিকাশের পেল না সুযোগ -- 
 দোষ কাকে দেবে গো সে? অভিযোগ জানাবে বা কাকে?
 তাকেও তো বলবেনা কেউ, 'কেন তুমি হওনি শিল্পী?
 কবি? গণিতজ্ঞ? গায়ক-বাদক? পরিপূর্ণ সুবাস কুসুম?'
 আক্ষেপ কেন তবে জাগে, দিনশেষে, বিশুষ্ক কোরকের?

 নাকি -আক্ষেপবোধ -- সম্ভাবনা-ডালি থেকে
 মুঠোভরে তুলে-নেওয়া জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার
 সৃজনী ক্ষমতা,আর স্রষ্টার অহংবোধসীমা
 বহুদূর ছাড়িয়ে যে-বিজন,গভীর বোধ
 আক্রান্ত করে, বিস্মিত, শ্রান্ত, বিষণ্ণ করে --
 
রূপকল্প অরূপের অপার ক্রন্দসীমাঝে
 
একাকী দাঁড়িয়ে-থাকা সর্বগুণহীন অস্তিত্বকে,
 সেই বোধ, সেই নিবিড় বিষাদ-নির্বেদ --
 অচিন্ত্য সে-চেতনার উন্মেষের ব্যথা
  আনন্দ যুগপৎ --   কি সেই চূড়ান্ত উপহার,
 না-জেনে যা নিয়েছিনু তুলে
 অস্তিত্বের প্রথম লগনে